ঢাকা, শুক্রবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৫
আপডেট : ১৩ অক্টোবর, ২০২৪ ১০:১৮

লজ্জার রেকর্ডে ভরপুর মাহমুদউল্লাহর বিদায়ী ম্যাচ

নিজস্ব প্রতিবেদক
লজ্জার রেকর্ডে ভরপুর মাহমুদউল্লাহর বিদায়ী ম্যাচ

মাহমুদউল্লাহর বিদায়ী ম্যাচ যে এতোটা বিবর্ণ হয়ে উঠবে তা হয়তো তিনি ভুলেও ভাবেননি। এমন কি অন্যরাও। দলগত কিংবা ব্যক্তিগত কোনোভাবেই রাঙানোর সুযোগ দেয়নি ভারত। খেলার অর্ধেক শেষ হতেই ম্যাচের ফলাফল নির্ধারিত হয়ে যায়। ভারত জয় আর বাংলাদেশের হার অবধারিত। টস জিতে ব্যাট করতে নেমে ভারত যদি স্কোরবোর্ডে ৬ উইকেটে ২৯৭ রান করে, তখন কি আর সেই ম্যাচের অবশিষ্ঠ বলে কোনো কিছু থাকে। জয়-পরাজয়ের মাঝে শুধু কতো রানের ব্যবধানে থাকে তার অপেক্ষায় থাকেন সবাই। সেটি হয়েছে ১৩৩ রানে। বাংলাদেশ করে ৭ উইকেটে ১৬৪ রান। রানের ব্যবধানে বাংলাদেশের এটি সবচেয়ে বড় হার। আগের হার ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ২০২২ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সিডনিতে ১০৪ রানে। দুই টেস্টের সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হওয়ার পর এবার তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজেও হোয়াইটওয়াশ হলো বাংলাদেশ। 

নিজের ক্যারিয়ারের শেষ টেস্টে মাহমুদউল্লাহ খেলেছিলেন ক্যারিয়ারের সেরা অপরাজিত ১৫০ রান। হারারেতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশ জিতেছিল ২২০ রানে। সেই মাহমুদউল্লাহ এবার খেলেছেন টি-টোয়েন্টি ক্যাারিয়ারে শেষ ম্যাচ। টেস্টের মতো টি-টোয়েন্টি  ক্রিকেটেও  নিজের শেষটা রাঙাতে মনে মনে স্বপ্নের জাল হয়তো বুনে রেখেছিলেন মাহমুদউল্লাহ। সঙ্গে সতীর্থরাও। কিন্তু দলটি যে ভারত। যারা আবার টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। তারা যে মাহমুদউল্লাহর বিদায়কে বিবর্ণ করে তুলার মঞ্চ বানিয়ে দেয়। রেকর্ডে রেকর্ডে ভরে তুলে ম্যাচ। ভঙ্গুর ব্যাটিং লাইনের বাংলাদেশে দলের বিপক্ষে ৬ উইকেটে ২৯৭ রান অতিক্রম করার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। বাংলাদেশের বিপক্ষে এটি যেমন দলগত সর্বোচ্চ, তেমনি ভারতেরও দলগত সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের বিপক্ষে আগের সর্বোচ্চ রান ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার। ২০১৭ সালে পচেফস্ট্রমে তারা ৪ উইকেটে  করেছিল ২২৪ রান। ১৪১ রানে অলআউট  হয়ে বাংলাদেশ হেরেছিল ৮৩ রানে। ভারতের আগের সর্বোচ্চ রান ছিল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৫ উইকেটে ২৬০। ২০১৭ সালে  ইন্দোরে তারা এই রান করেছিল। বাংলাদেশের বিপক্ষে ভারতের এই রান আবার টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। সর্বোচ্চ  রান নেপালের। মঙ্গোলিয়ার বিপক্ষে  ২০২৩ সালে এশিয়ান গেমসে হাংজুতে তারা  ৩ উইকেটে করেছিল  ৩১৪ রান। 

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এতো রান করার সাধ্য বাংলাদেশের নেই। সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড ২১‌৪ রানের। ২০১৮ সালে নিদাহাস ট্রফিতে শ্রীলঙ্কার ৬ উইকেটে করা এই রান বাংলদেশ অতিক্রম করেছিল ২ বল হাতে রেখে ৫ উইকেট হারিয়ে। তা  ছাড়া এই সিরিজের প্রথম দুই ম্যচে যথাক্রমে ১২৭ ও ১৩৫ রান করে বাংলাদেশ নতুন করে আরেকবার বুঝিয়ে দিয়েছে তাদের ব্যাটিং সীমাবদ্ধতা। শান্তনা তিনটি ম্যাচেই বাংলাদেশ দলগত সংগ্রহের ক্রমান্বয় উন্নতি করেছে। অদূর ভবিষ্যৎয়ে মাহমুদউল্লাহ যখন নিজের ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচের স্মৃতি চারণ করবেন, তখন তিনি নিজেও হয়তো লজ্জ্বা পাবেন। আবার নিজেও যে স্মরণীয় করে রাখার মতো কিছু করতে পারেননি। বল হাতে ২ ওভারে ২৬ রান দিয়ে ১ উইকেট নেওয়ার পর  ব্যাট হাতে  ৯ বলে করেন ৮ রান।

খেলা শুরুর আগে বৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু তাতে নির্ধারিত সময়ে খেলা শুরু হতে কোনো বাধা হয়নি। কন্ডিশনের পরিবর্তন হলেও ভারতের অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব উইকেট পড়তে পারলেও বাংলাদেশের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত উইকেট পড়তে পারেননি সঠিকভাবে। যে কারণে ভারতীয় কাপ্তান টস জিতে শুধু ব্যাটিংই বেছে নেননি, সেরা একাদশে একজন পেসার কমিয়ে স্পিনার বাড়িয়ে নেন। কিন্তু বাংলাদেশের সেরা একাদশে দুইটি পরিবর্তন আনা হলেও প্রথম দুই ম্যাচের মতোই পেসার তিনজন আর স্পিনার দুইজনই রাখা হয়। নিজেদের ব্যাটিংয়ের সময় ভারতীয় ব্যাটাররা পেস কিংবা স্পিন কোনো কিছু বাছাই করেনি। সব বোলারেরই ওভার প্রতি রান ছিল দশের ওপরে। কিন্তু বাংলাদেশের ইনিংসে ভারতীয় তিন স্পিনার পুরো ফায়দা তুলে নেন। তিন স্পিনার বরুন চক্রবর্তী, ওয়াশিংটন সুন্দর আর রবি বিষ্ণনুইকে খেলতেই পারেননি বাংলাদেশের ব্যাটাররা। বিশেষ করে বিষ্ণনুইকে। ৪ ওভারে  ৩০ রান দিয়ে নেন  ৩ উইকেট। বরুণ চক্রবর্তী কোনো উইকেট না পেলেও ৪ ওভারে রান দেন ২৩। ওয়াশিংটন সুন্দর ১ ওভারে ৪ রান দিয়ে নেন ১ উইকেট। স্পিন ধরাতে অভিষেক শর্মাকে দিয়েও এক ওভার বোলিং করানো হয়।  রান দেন ৮। সেই তুলনায় তিন পেসার মায়াঙ্ক যাদব ( ৪ ওভারে ৩২ রানে ২ উইকে), হার্দিক পান্ডিয়া (৩ ওভারে ৩২ রানে ০ উইকেট) ও নিতিশ কুমার (৩ ওভারে ৩১  রানে  ১ উইকেট) বেশ ব্যয়বহুল ছিলেন।

২৯৭ রান তাড়া করে  যে কোনো দলের জন্য জয় পাওয়া কঠিন। বাংলাদেশের জন্য আরো বেশি কঠিন। দেখার বিষয় ছিল ভঙ্গুর ব্যাটিং লাইন নিয়ে কতোদূর যেতে পারে নাজমুল শান্তর  দল। কিন্তু প্রথম বলেই  পারভেজ ইমন আউট হয়ে রণেভ ভঙ্গ দেন। সিরিজে প্রথমবারের মতো খেলতে নামা ওপেনার তানজিদ তামিম ভালো করার ইংগিত দিয়েছিলেন। কিন্তু  বেশি দূর যেতে পরেননি। ১২ বলে ১৫ রান করেন তিনি।  নাজমুল টেস্টের মতো টি-টোয়েন্টিতেও  রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়ে রবি বিষ্ণনুইকে উইকেট উপার দিয়ে আসেন। ওপেনিং থেকে চারে নেমে দলের স্রোতের বিপরীতে ভালোই আক্রমণাত্বক ছিলেন লিটন। নিতিশ কুমারের প্রথম ওভারে ৫ বাউন্ডারিতে ২০ রান আদায় করে সম্মানজনক রান করার ইংগিত দিয়েছিলেন। খেলছিলেনও সেভাবে। সেই ধারাবাহিকতায়ই রবি বিষ্ণনুইকে ছক্কা হাকাতে গিয়ে আউট হয়ে যান ২৫ বল ৮ চারে  ৪২ রান করে। এরপর দলের রান ৭ উইকেটে পর্যন্ত যেতে পেরেছে তাওহিদ হৃদয়  ৪২ বলে ক্যারিয়ারের সেরা অপরাজিত  ৬৩  ইনিংস খেললে।  ৩৫ বলে রবি বিষ্ণনুইকে ছক্কা মেরে তুলে নেন ক্যারিয়ারের তৃতীয় হাফ সেঞ্চুরি। 

এর  আগে ভারত টস জিতে শুরুতেই অভিষেক শর্মার উইকেট হারালে তা যেন তাদের কল্যাণ বহে আনে। দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে  সাঞ্জু স্যামসন ও অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব ১১.৩ ওভারে ১৭৩ রান যোগ করেন। সাঞ্জু ৪৭ বলে ৮ ছক্কা ১১ চারে ক্যারিয়ারের সেরা ১১১ রান করে তিনি মোস্তাফিজের বলে শেখ মাহেদির হাতে ধরা পড়েন। সূর্যকুমার যাদবকে শিকার  করেন  মাহমুদউল্লাহ।  ৩৫ বলে ৫ ছক্কা ও  ৭৫ রান করার পর তার ক্যাচ ধরেন রিশাদ হোসেন। এই দুই জন আউট হওয়ার পর ভারতের রানের চাকা সচল  রাখার কাজটি  করে যান রিয়ান পরাগ ১৩ বলে ৪ ছক্কা  ও ১ চারে  ৩৪, হার্দিক পান্ডিয়া ১৮ বলে ৪টি করে চার  ও ছয় মেরে ৪৭ রান করে। তানজিম সাকিব  ৩ উইকেট নিলেও ৪ ওভারে রান দেন  ৬৬।  তাসকিন ৪ ওভারে ৫১ রানে, মোস্তাফিজ ৪ ওভারে ৫২ রানে ও মাহমুদউল্লাহ ২ ওভারে ২৬ রানে ১টি করে উইকেট নেন।

উপরে