অর্থনীতিকে বড় করতে উৎপাদন শিল্পই মুখ্য ভূমিকা রাখছে

দেশের অর্থনীতি বড় হচ্ছে। বড় হওয়ার পেছনে কাঠামোগতভাবে একসময় কৃষির অবদান সবচেয়ে বেশি থাকলেও বর্তমানে সেই চিত্রে পরিবর্তন এসেছে। কৃষির জায়গাটি দখল করে নিয়েছে সেবা ও শিল্প খাত। গত পাঁচ বছরের সরকারি তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দেশের অর্থনীতিতে ধারাবাহিকভাবে অবদান বাড়িয়ে চলেছে উৎপাদন শিল্প (ম্যানুফ্যাকচারিং)। অর্থনীতিকে বড় করতে এ খাতই এখন মুখ্য ভূমিকা রাখছে।
কৃষিনির্ভর অর্থনীতির কাঠামো বদলাতে শুরু করে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে। মূলত পোশাক শিল্পের হাত ধরে বড় হতে থাকে ম্যানুফ্যাকচারিং খাত। পোশাক খাতের সংযোগ হিসেবে গড়ে ওঠে অনেক শিল্প। এছাড়া ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় পোশাক খাতের পাশাপাশি বেশকিছু ভারী শিল্পও গড়ে উঠতে থাকে। আর এভাবেই অর্থনৈতিক কাঠামোতে জায়গা করে নিতে শুরু করে উৎপাদন খাত।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ প্রকাশিত অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২০-এর তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, অর্থনীতিতে কৃষির অবদান কমতে কমতে ১৫ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। গত পাঁচ বছরে ক্ষেত্রবিশেষে কমেছে সেবা খাতের অবদানও। অন্যদিকে ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলেছে উৎপাদন শিল্পের অবদান।
অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য বলছে, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) খাতওয়ারি অবদানের হারে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে ম্যানুফ্যাকচারিং খাত। পাঁচ অর্থবছর ধরে এ অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো জিডিপিতে এ খাতের অবদান ২০ শতাংশ অতিক্রম করে। এরপর এ অবদান বেড়ে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২১ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২১ দশমিক ৭৪, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২২ দশমিক ৮৫, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২৪ দশমিক শূন্য ৮ এবং সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২৪ দশমিক ১৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অনেকদিন ধরে বড় হচ্ছিল দেশের সেবা খাত। সেই সঙ্গে বড় অবদান রাখছিল জিডিপিতে। তবে ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকেই জিডিপিতে সেবা খাতের অবদানের আনুপাতিক হারটা মোটামুটি একই আছে। এরই মধ্যে কিছুটা কমেছেও। অন্যদিকে কৃষির অবদান কমে যাওয়ার ধারাও অব্যাহত আছে। কিন্তু উৎপাদন শিল্প খাতটি ধারাবাহিকভাবে এগোচ্ছে। বেশ বৈশিষ্ট্যপূর্ণভাবেই এগোচ্ছে। এটা খুব ভালো একটা লক্ষণ। এক ধরনের নতুন কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. কেএএস মুরশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, আমি মনে করি ভিয়েতনামের পরে বাংলাদেশও এখন ‘ফ্লাইং গিজ থিওরি’ অনুযায়ী এগোচ্ছে। যে দেশগুলো আগে উন্নত হয়ে গেছে তারা জাপানের নেতৃত্বে একত্রে উড়ে যাচ্ছে অনেকগুলো পাখির মতো। আরো অনেক দেশ সেখানে ধীরে ধীরে যোগ দিচ্ছে। সর্বশেষ যোগ দিয়েছে ভিয়েতনাম। আমার মনে হয় বাংলাদেশও ডানা মেলল। আরো তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে, বাংলাদেশে অনেক কিছু ঘটছে, যেটা সামগ্রিক তথ্যে দৃশ্যমান হচ্ছে না। আমাদের ইস্পাত ও সিমেন্টের মতো ভারী শিল্প আছে। ভারী শিল্প আরো ব্যাপক হারে হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল শিল্পের ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতিও অচিরেই কেটে যাবে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
বাংলাদেশে হালকা প্রকৌশল ও ইলেকট্রনিক শিল্পেও ব্যাপক উন্নয়ন দেখা যাচ্ছে জানিয়ে ড. কেএএস মুরশিদ বলেন, মাথাপিছু আয় একটা পর্যায়ে গেলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা তৈরি হয়। সে কারণেই দেশে ইলেকট্রনিক পণ্যের চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়েছে। এক্ষেত্রে আগে আমদানিনির্ভরতা থাকলেও এখন স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন শুরু হয়েছে। অচিরেই স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে এসব পণ্য রফতানি শুরু হবে বলেও আশা করা যাচ্ছে। আগামী পাঁচ-দশ বছরে এ ধরনের পণ্যনির্ভর শিল্পায়ন আরো গতিশীল হবে। এখনই অটোমোবাইল নির্মাণের আলোচনা শুরু হয়েছে। আমার কাছে মনে হয় আমরা ডানা মেলেছি। এখন মহাপ্রলয় জাতীয় কিছু না ঘটলে আমরা এ পথ ধরে অনেক এগিয়ে যাব। আর এটাই হচ্ছে ট্র্যাডিশনাল ক্ল্যাসিক্যাল প্যাটার্ন।
অর্থনীতির ক্ল্যাসিক্যাল প্যাটার্ন বলতে বোঝায় শিল্প খাত ধরেই এগিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশে বিষয়টি প্রায় সুপ্ত ছিল। এখন ধীরে ধীরে এটা প্রকাশ পাচ্ছে। বর্তমানে পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার যে দেশগুলোকে নতুন শিল্পনির্ভর দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাদের মধ্যে কোরিয়া ছাড়া সবাই ক্ল্যাসিক্যাল প্যাটার্নেই এগিয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উৎপাদন শিল্পের অবদান বৃদ্ধির বিষয়ে বলতে গিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতের উদাহরণ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, ভারতে এখন সেবা খাতের ওপরই বেশি নজর, উৎপাদন শিল্প খাতটা তেমন ভূমিকা রাখতে পারছে না। ভারতে সেবা খাত বলতে শুধুই আইসিটি-নির্ভরতা। এ নির্ভরতায় তারা এগোচ্ছে বটে, কিন্তু ভারতের মতো দেশে যেখানে বেকারত্বের হার এত বেশি সেখানে কিছুসংখ্যক জনগোষ্ঠীর জন্য ভালো হলেও গোটা দেশবাসীর জন্য এ ধারা ভালো না হওয়ার শঙ্কা আছে।
একই সুরে কথা বলছেন শিল্পোদ্যোক্তারাও। তাদের ভাষ্য, জনসংখ্যা বিবেচনায় নিলে উৎপাদনমুখী শিল্পে মনোযোগী হওয়া ছাড়া বাংলাদেশের সামনে কোনো বিকল্প নেই। কারণ উৎপাদনমুখী শিল্পই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। তাই এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দেশে এখন সেবা খাতের অবদানটা বেশি, ক্ষেত্রবিশেষে মনোযোগও এ খাতে বেশি। এখন সবাই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কথা বলছে, যেখানে শিল্প ও সেবা খাতের বড় অংশই হবে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর। সেখানে লোকবল বেশি ব্যবহার করা যাবে না। এ অবস্থায় আমাদের লক্ষ্য নিতে হবে কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক। টাকা এল, সেটা অল্প কিছু লোকের কাজে লাগল আবার বেকারত্বও থেকে গেল—এ পরিস্থিতি খুব লাভজনক হবে না।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বণিক বার্তাকে বলেন, আমাদের মতো দেশে অর্থনীতির ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্ব হলো শিল্পনির্ভর অর্থনীতি। এর মধ্যে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতই বড় ভূমিকায় থাকবে। এমনকি কৃষি খাতেও প্রযুক্তি প্রবেশ করবে। এর মানে এই নয় যে বেকারত্ব বাড়বে। যেখানে গোটা পৃথিবী প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের দিকে হাঁটছে, সেখানে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছি। আমাদের জনসংখ্যা বিবেচনায় নিতে হলে শ্রমঘন শিল্প থাকতে হবে। গার্মেন্টস ও বস্ত্র খাত আরো অনেক সংকুচিত হবে। চামড়া ও হালকা প্রকৌশল খাতে অনেক সম্ভাবনা রয়ে গেছে। এখন বলা হচ্ছে, ইলেকট্রিক গাড়ির বাজার হবে ৩০ ট্রিলিয়ন ডলারের। এ সুযোগ আমাদেরও কাজে লাগাতে হবে। অনেক দূরে হলেও আমরা সেই পথেই আছি বলে এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে।
এখনই শ্রমঘন শিল্পনির্ভর পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে এবং এর জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে বলে মনে করেন আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ। তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য দেশের বাইরের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতামূলক উদ্যোগ নিতে হবে। এর মাধ্যমে তাদের দক্ষতা বাড়াতে হবে। দক্ষতার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে পৃথক একটি মন্ত্রণালয় গঠন করে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি ও পেশাদার শিল্পসংশ্লিষ্ট কর্মী বাহিনী গড়ে তোলা সম্ভব হয়।
তবে শিল্পনির্ভর অর্থনীতির ধারা অব্যাহত রাখার কিছু চ্যালেঞ্জ আছে বলে জানিয়েছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, আমাদের রাজনৈতিক অর্থনীতিটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখন সরকারের ড্রাইভিং সিটে যারা আছেন তাদের বেশির ভাগই শিল্প খাতসংশ্লিষ্ট। কাজেই তাদের গৃহীত নীতি পছন্দ করি আর না-ই করি, তা শিল্পায়নের পক্ষেই যাবে। তবে একটা বড় ঝুঁকি আছে। সেটা হলো কালো অর্থনীতি। এই কালো অর্থনীতি একটা বড় আঘাত হানতে পারে। এ বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ এটা বিপত্সংকেত। কালো অর্থনীতির ব্যাপকতায় মাফিয়ারা অনেক বড় ক্ষমতার অধিকারী হয়ে গেলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করতেই একটা বড় সময় অতিবাহিত হয়ে যাবে। আমরা সেই ধাপে প্রবেশ করছি কিনা স্পষ্ট করে বলা না গেলেও সার্বিক পরিস্থিতি ভালো ঠেকছে না।
বড় সুবিধাভোগী শিল্পগোষ্ঠী, কালো অর্থনীতির মতো চ্যালেঞ্জগুলো থাকলেও শিল্প খাত সূত্রগুলো বলছে, চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য শিল্পোৎপাদননির্ভর হয়ে এগিয়ে যাওয়া থেমে থাকবে না। বরং যথাযথ পদ্ধতি উন্নয়ন করে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। দেশের অনেক ভারী শিল্প যেমন ইস্পাত, সিমেন্টের মতো খাতগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। ফলে বর্তমানে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানই উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করতে পারে না। তার পরও ম্যানুফ্যাকচারিং খাতনির্ভর হয়ে অর্থনীতির এগিয়ে যাওয়ার তথ্য শ্রমঘন বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।