করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের শঙ্কা পোশাক খাতেও

করোনাভাইরাসের প্রথম ধাক্কা সামলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত যখন ঘুরে দাঁড়িয়েছে, ইউরোপে দ্বিতীয় দফায় সংক্রমণ বাড়ায় দেশের জন্য নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে।
পোশাক রফতানিকারকরা উদ্বিগ্ন, এই দ্বিতীয় ঢেউ দেশের পোশাক শিল্পে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, দ্বিতীয় ঢেউ কতটা তীব্র হয়, তার ওপর নির্ভর করছে সবকিছু। প্রথম ধাক্কা মোকাবেলায় ইউরোপ ও আমেরিকা এক ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ফলে কম সময়ে দ্বিতীয় ঢেউ সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে বলে আশা করছেন তারা।
ইউরোপে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেছেন, সেখানে ধাক্কা লাগলে বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়বে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছে, বিশ্বব্যাপী করোনার দ্বিতীয় ঢেউ হবে আগের চেয়ে ভয়াবহ।
যুক্তরাজ্যে দিনে এক লাখ নতুন রোগী আক্রান্ত হচ্ছে। জার্মানি ও ফ্রান্সে প্রথম দফার তুলনায় দ্বিতীয় দফায় সংক্রমণ বেশি। সংক্রমণ ঠেকাতে এরই মধ্যে দেশ দুটিতে এক মাসের জন্য লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে।
বাংলাদেশের পোশাক পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপ আর একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে জার্মানি-ফ্রান্সে লকডাউনের দিকে চোখ রাখছেন বাংলাদেশের পোশাক মালিকরা।
বাংলাদেশে মোট রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশ আসে পোশাক পণ্য থেকে। গত অর্থ বছরে (২০১৯-২০) পোশাক রফতানির পরিমাণ দুই হাজার ৭৯৫ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ শতাংশ কম।
পোশাক রফতানিকারকরা জানান, অর্ডার (আদেশ) পাওয়ার পিক আওয়ার নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত। এই সময়ে বেশি আদেশ দেন ক্রেতারা। করোনার দ্ধিতীয় ধাক্কা লাগায় ওই সব আদেশ পাওয়ার ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। ধীরে চলছেন ক্রেতারা।
পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা বলেছেন, এখন যে সব আদেশ পাওয়ার কথা, সেগুলো শিপমেন্ট বা সরবরাহকারীর কাছে পৌঁছার সময় ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে। শেষ পর্যন্ত আদেশগুলো বাতিল হলে প্রভাব পড়বে রফতানি আয়ে।
যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচার্রাস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইর) প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারব। কিন্তু ইউরোপ ও আমেরিকায় করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ায় নতুন আদেশ থেমে আছে। পরিস্থিতি দেখে-শুনে সিদ্ধান্ত নেবেন ক্রেতারা। ফলে আবার অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।’
করোনা পরবর্তী বিশ্ববাজারে বাংলাদেশর পোশাকের দাম ১০ শতাংশ কমে গেছে জানিয়ে হাতেম বলেন, নতুন করে সংকট তৈরি হওয়ায় দাম আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কায় তারা।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক ঊর্ধ্বতন পরিচালক, অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জায়েদ বখত বলেন, ‘করোনার দ্বিতীয় ধাক্কার অভিঘাত কিছুটা আসবে। আমরা ধারণা, ইউরোপ ও আমেরিকার জনগণ শক্ত হাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। ফলে বেশি বিচলিত হওয়ার কারণ নেই।’
বর্তমানে ইউরোপের ২৩ টি দেশে বাংলাদেশি পোশাক পণ্য রফতানি হয়। এর মধ্যে জার্মানিতে যায় সবচেয়ে বেশি।
মহাদেশের ৩০ শতাংশ পোশাকই পাঠানো হয় এই একটি দেশে। গত অর্থবছরে দেশটিতে ৫৭৭ কোটি ডলারের পোশাক পণ্য রফতানি হয়। এর পরই রয়েছে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স।
ইউরোপে বাংলাদেশি পোশাক পণ্যের বেশি রফতানি হওয়ার প্রধানতম কারণ শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার। এ ছাড়া রয়েছে রুলস অব অরজিনের শিথিল শর্ত।
আমেরিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ভালো হলেও অন্যান্য দেশের সঙ্গে শুল্ক দিয়ে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে রফতানি করে। যদিও শুল্কমুক্ত সুবিধার আদায়ের দাবি করে আসছে এক দশক থেকে বাংলাদেশ সরকার।
স্থানীয় পোশাক মালিকরা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাংলাদেশি পোশাক পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলে রফতানি আয় এখন যা আছে, তার চেয়ে অতিরিক্ত এক বিলিয়ন ডলার বা ১০০ কোটি ডলার বাড়বে।
জাপান, চীন রাশিয়া, ভারতসহ কিছু দেশ পোশাক পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলেও কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ।
শুল্ক-অশুল্ক বাধাসহ নানা জটিলতার কারণে ওই সব দেশে প্রত্যাশিত রফতানি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নির্দিষ্ট দেশের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।
বিকেএমইএ নেতা মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘নতুন বাজার খোঁজা খুবই কঠিন।’
করোনার প্রভাবে গত মার্চ থেকে দেশের রফতানিতে ধস নামে। তৈরি পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর হিসাবে, গত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত, ৩১৫ কোটি ডলারের রফতানি আদেশ বাতিল হয়।
এরপর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়। চলতি অর্থবছরের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে তেজিভাব দেখা যায়। অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর ফলে রফতানি খাতে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।